চাদারিয়া ঝিনি রে ঝিনি

চাদারিয়া ঝিনি রে ঝিনি



ছয়-সাত বৎসর পূর্বে ফুফাতো ভাই মোবারক আমাকে একটি গান শোনায়। গানটি খুবই ভালো লাগে। খুবই চমৎকার একটি গান। তৎক্ষণাৎ গানটি ডাউনলোড করিয়া শুনিতে লাগিলাম। গানের সকল কিছুই বুঝলাম তবে "চাদারিয়া ঝিনি রে ঝিনি" এই বাক্যটি বুঝিলাম না। এরপর ইহা লইয়া গবেষণা শুরু করিলাম।


আজকাল দেখিতেছি দেবী মিম এই গানটি লইয়া খুবই আগ্রহ দেখাইতেছেন। এই গানটি শুনিলে নাকি তাহার অন্তঃকরণ বেদনার ঘন ছায়ায় আচ্ছন্ন হইয়া যায়। জানি না কোন ভক্তের আরাধনায় তিনি মুগ্ধ। হয়তো ওই ভক্তের অক্লান্ত সাধনা দেখিয়া দেবীর মনে করুণা জাগিয়া উঠিয়াছে। তাই গানটি শুনিবা মাত্রই সে ব্যথিত হইয়া যায়।

বলিউডের 'বাদলাপুর' মুভির গানটিতে কবির দাসের দোঁহার শুদ্ধ 'চাদারিয়া ঝিনি রে ঝিনি'-এই বাক্যটি গাওয়া হইয়াছে। অনেকের মনেই হয়তো আমার মতন কৌতূহল জন্মাইতে পারে 'চাদারিয়া ঝিনি রে ঝিনি'-এর অর্থ কী? 

তাই ইহার সরল অনুবাদ করিবার চেষ্টা করিলাম।


কবির দাস বাংলার লালনের মতনই একজন অসাম্প্রদায়িক আধ্যাত্মিক কবি ছিলেন। আপামরসাধারণের নিকট তাঁহার অহিংসার বাণী পৌঁছাইতে তিনি আশেপাশের চিরচেনা কিছু উপমা ব্যবহার করিতেন। এইজন্য তিনি হইয়া উঠিয়াছেন জনসাধারণের কবি। 

তবে উনি দোঁহাসমূহ জীবিতাবস্থায় লিখিয়া যান নাই। ভক্তদের মুখে মুখে এই দোঁহা প্রচারিত হয়। সময়ের সাথে সাথে বেশ কিছু পরিবর্তন সংঘটিত হইয়াছে। তাই একই দোঁহার একেক জায়গায় একেক রকম পাঠ পরিলক্ষিত হয়। 


চাদারিয়া ঝিনি রে ঝিনি

______________________


১.

"কাবিরা, জাব হাম প্যায়দা হুয়ে

জাগ হাসে হাম রোয়ে

এ্যায়সি কারনি কার চালে

হাম হাসে জাগ রোয়ে।

রাম-নাম রস বিনি

চাদারিয়া ঝিনি রে ঝিনি"


'কবির, যখন আমি জন্ম লইলাম

জগৎ হাসিয়াছে আমি কাঁদিয়াছি

এমন কাজ করিয়া যা

আমি হাসিবো জগৎ কাঁদিবে।

রাম নামের রসে বোনা

চাদর স্বচ্ছ পাতলা'


২.

"অষ্ট কমল কা চরখা বানায়া

পঞ্চ তত্ভ কি পুনি

নয়-দশ মাস বুনান কো লাগে

মূর্খ ম্যায়ল কিনি"


'আটটি পদ্মের চরকায় তৈয়ার

পঞ্চভূতের তুলায়

নয়-দশ মাস লাগিয়াছে বুনিতে

মূর্খরা ময়লা করিয়াছে।'


৩.

"জাব মেরি চাদার বান ঘার আয়ি

রাঙ্গরেয কো দিনি

এ্যায়সি রাঙ্গা রাঙ্গরেয নে

লাল হি লাল কার দিনি"


'যখন চাদর তৈয়ার হইয়া ঘরে আসে

তখন তা রঙমিস্ত্রিকে দিলাম

এমন রঙ করিল রঙমিস্ত্রি

লালে সম্পূর্ণ রঞ্জিত করিয়া দিলো।'


৪.

"চাদার ওড় শঙ্কা মাত কারিও

দো দিন তুমকো দিনি

মূর্খ লোগ ভেদ নাহি জানে

দিন দিন ম্যায়ল কিনি"


'চাদর পরিধান কর, সন্দেহ বা ভয় করিও না

দুই দিনের তরে ইহা দেওয়া হইয়াছে

মূর্খ মানুষেরা হাকিকত জানে না

তাই দিনের পর দিন ময়লা করে।'


৫.

"ধ্রুভ, প্রহ্লাদ, সুদামা নে ওড়ি

শুকদেব নে নির্মল কি

দাস কাবির নে জাতান সে ওড়ি

জেয়ো কি তোয়ো ধারা ধিনি"


'ধ্রুব, প্রহ্লাদ, সুদামা পরিধান করিয়াছে

শুকদেব নির্মল করিয়াছে

সেবক কবির অনেক কষ্টে পরিধান করিয়াছে

যেমন ছিল তেমনই ফেরত দেবে।'




সংক্ষিপ্ত আকারে ইহার মর্মার্থ:



(১) কবির দাস এইখানে মানুষকে বলিতেছেন, এমন কোনো ভালো কাজ করিয়া যাও, যাতে করিয়া মানুষজন তোমার মৃত্যুর পর তোমার অভাব বোধ করে। তোমার পরলোক গমনে লোকেরা যেন ব্যথিত হয় এবং তুমি তোমার কর্মের জন্য আনন্দিত হও।

কবির দাস এইখানে দেহকে রূপকভাবে চাদর বলিয়াছে।

রাম বা প্রভু নামের রসে বোনা এই চাদর অর্থাৎ দেহ খুবই স্বচ্ছ ও পাতলা।


(২) অষ্টকমল বা অষ্টপদ্ম অর্থাৎ অষ্টপাশের চরকায় বানানো এই দেহ।

আর্য সারথী এই অষ্টপাশের ব্যাখ্যায় বলেন,

"এই 'অষ্টপাশ' নাম শুনিলেই বোঝা যায় এইখানে আটটি পাশের কথা বলা হইয়াছে। পাশ শব্দের অর্থ হইলো জাল, দড়ি ও বন্ধন। এমন কী কী বিষয় আছে যাহাকে সাধক-মহাজনেরা জাল বা দড়ি জ্ঞান করেন? এই আটটি বস্তু হইতেছে ঘৃণা, লজ্জা, ভয়, শঙ্কা, জুগুপ্সা, কুল, শীল ও জাতি। এই আটটি বিষয়কেই একত্রে অষ্টপাশ বলা হয়।


এবার একে একে বুঝিয়া লই ইহাদের অর্থ:

ঘৃণা— মানে অশ্রদ্ধা, অবজ্ঞা, বিদ্বেষ, বিতৃষ্ণা ইত্যাদি। এর দ্বারা জগতে শান্তিপ্রতিষ্ঠা করা যাইবে না। ইহা কোন্দল ব্যতিত কিছুই বাড়াইতে পারে না।

লজ্জা— মানে কোনো কাজে মানসিক বাধা, অস্বস্তি ইত্যাদি বোঝায়। লজ্জার দ্বারা মানুষ হয় কর্মবিমুখ। 

ভয়— ভয় মানে হইলো কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে আতঙ্কিত হওয়া। 

শঙ্কা— অর্থ দ্বিধা বা সংশয়। 

জুগুপ্সা- অর্থ নিন্দাচর্চা। 

কুল— অর্থ বংশ বা গোত্র। 

জাতি— জাতি অর্থ জন্ম বা উৎপত্তি। ইহা তো সাধারণ অর্থ। কিন্তু এইখানে জাতি অর্থ আসক্তি বা তৃষ্ণা হিসাবে বুঝিতে হইবে। হইতে পারে এই আসক্তি অর্থের প্রতি।

শীল— এইখানে শীল বলিতে বোঝাইতেছে দম্ভ। 


এই অষ্টপাশ ত্যাগ করিতে পারিলে পরমকে পাওয়া যায়। আসক্তি, দম্ভ, বংশের গৌরব, নিন্দাচর্চা, সংশয়, ভয়, লজ্জা ও ঘৃণা হতে মুক্ত হইবার চর্চায় আমরা সন্ধান পাইবো পরমের এবং নির্মাণ করিতে পারিব ভোগবাদ ও শোষণবাদ মুক্ত সমাজের।"


এই চাদর বা দেহ বুননের তুলা বা উপাদান হইতেছে পঞ্চভুত। ক্ষিতি, অপ্ , তেজ, মরুৎ, ব্যোম এই পাঁচ বস্তুকে বলা হয় পঞ্চভূত।

ক্ষিতি- পৃথিবী বা মাটি

অপ্— জল

তেজ— অগ্নি, জ্যোতি

মরুৎ— বায়ু

ব্যোম— আকাশ।

বলা হয়ে থাকে এই পাঁচটি বস্তু দিয়ে সমগ্র বিশ্বের সৃষ্টি।


এই চাদর অর্থাৎ দেহ তৈরি হইতে নয়-দশ মাস সময় লাগে। কিন্তু মূর্খ লোকেরা এই দেহকে অন্যায় কর্ম দ্বারা দ্রুত ময়লা করিয়া ফেলে।



(৩) যখন এই চাদর বা দেহ তৈয়ার হইয়া ঘরে বা ধরণীতে আসে, তখন তা রঙমিস্ত্রি বা গুরুর কাছে অর্পণ করা হয়। উনি এমন ভাবে রঙ করেন যাতে সম্পূর্ণ দেহ বা চাদর লাল হইয়া যায়। লাল বলিতে এইখানে পূণ্যাত্মা বোঝানো হইয়াছে।


(৪) চাদর বা দেহ লইয়া অহেতুক শঙ্কা বা ভয় করা উচিত নয়। ইহা তো মাত্র দুই দিনের জন্য দেওয়া হইয়াছে। শত অভাবেই থাকুক বা বাদশাহী হালতেই দিন কাটুক। একদিন ইহা ধূলিসাৎ হইবে।

কিন্তু কিছু লোক ইহার মর্মার্থ বোঝে না। তাই পরিষ্কার চাদর বা দেহটাকে পাপ দ্বারা পঙ্কিল করিয়া ফেলে।


(৫) ধ্রুব, প্রহ্লাদ ও সুদামা এই তিন মহাপুরুষও এই চাদর বা দেহ ধারণ করিয়াছে।

ধ্রুব— তিনি একজন বিষ্ণু ভক্ত।

প্রহ্লাদ— তিনি হিরণ্যকশিপুর সন্তান ও অসুরদের রাজা‌ তবে বিষ্ণুর ভক্ত। হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদকে হত্যা করিতে উদ্যত হইলে, বিষ্ণু নরসিংহ রূপ ধরিয়া মর্তে অবতীর্ণ হন এবং হরণ্যকশিপুকে হত্যা করিয়া প্রহ্লাদকে উদ্ধার করেন।

সুদামা— উনি কৃষ্ণের বাল্যবন্ধু। যে একবার বাল্যকালে নিজের আহারের চিড়া কৃষ্ণকে অর্পণ করিয়া কৃষ্ণের ক্ষুধা নিবারণ করিয়াছিলেন। বড় হইলে খুবই দারিদ্র অবস্থায় একবার কৃষ্ণের প্রাসাদে আসিয়াছিলেন বাল্যবন্ধুর সহিত দেখা করিতে। কৃষ্ণ তাহার সহিত খুবই আন্তরিকভাবে মিলিত হন এবং আবারও চিড়া খাওয়াইবার আবদার করেন। সুদামা চিড়া দিলে পরে কৃষ্ণ তাহাকে বর দান করেন। দারিদ্রতা বিমোচন করেন।


শুকদেব— মহর্ষি ব্যাসদেবের পুত্র শুকদেব। ব্যাসদেবের তপস্যায় তুষ্ট হইয়া মহাদেব বর দিয়েছিলেন যে, ব্যাসদেব অগ্নি, বায়ু, জল, ভূমি ও আকাশের ন্যায় পবিত্র পুত্র লাভ করিবেন। এমন পুত্র যে ব্রহ্মপরায়ণ হইয়া যশস্বী হইবেন। বরলাভ করিয়া ব্যাসদেব যখন সুমেরুশৃঙ্গে বসিয়া দুইটি অরণিকাষ্ঠ লইয়া অগ্নি সৃষ্ট করিবার চেষ্টা করিতেছেন, তখন স্বর্গ হইতে অপ্সরা ঘৃতাচি সেইখানে শুক বা তোতা রূপে আসিলেন। ঘৃতাচিকে দেখিয়া কামাবিষ্ট হইয়া ব্যাসদেবের বীর্য অরণিকাষ্ঠের উপর স্খলিত হইলে সেইখান হইতে শুকদেবের জন্ম হয়।


কিংবদন্তি আছে যে— অপ্সরাগণ নগ্ন হইয়া নদীতে স্নান করিবার সময় সেইখান দিয়া নগ্ন শুকদেব চলাচল করিলেও অপ্সরাগণ বিচলিত হইতো না। কেননা তাহারা জানিত শুকদেব পবিত্র। 


সর্বশেষে কবির দাস বলেন, বহু যাতনা করিয়া এই দেহ লাভ করিয়াছেন তিনি‌।

 সুতরাং যেমন পবিত্র দেহ পাইয়াছিলেন, ঠিক তেমনি পবিত্র দেহ ফেরত দেবেন। ইহাতে কোনো পাপের দাগ লাগিতে দেবেন না। 




#সূফি_sufi



Comments